
রাত তখন গভীর। যখন পুরো বাংলাদেশ শান্তিতে ঘুমে মগ্ন, তখন সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরীদের জাগ্রত থাকার কথা। কাঁটাতারের ওপার থেকে মরণনেশা মাদক কিংবা অবৈধ কোনো পণ্য যাতে এদেশের মাটিতে ঢুকতে না পারে, সেই গুরুদায়িত্ব যাদের কাঁধে—তাদের ওপরই কি আজ কলঙ্কের দাগ? ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার কসবা উপজেলা। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের এই জনপদটি দীর্ঘকাল ধরে চোরাচালানের জন্য একটি সংবেদনশীল পথ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সম্প্রতি এই সীমান্তেই ঘটে গেল এক নজিরবিহীন বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনা।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার টিম ‘তালাশ ক্রাইম দৃষ্টি’। যাদের কাছে গোপন সোর্সের মাধ্যমে খবর আসে যে, কসবা উপজেলার আকাবপুর, কুইয়া-পানিয়া, খিরনাল ও ধজনগর সীমান্ত দিয়ে এক বিশাল ভারতীয় পণ্যের চালান বাংলাদেশে ঢুকতে যাচ্ছে। সাংবাদিকরা তাদের পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়ে সরাসরি যোগাযোগ করেন স্থানীয় বিজিবি ক্যাম্প কমান্ডারের সাথে। উদ্দেশ্য ছিল একটাই—রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা এবং চোরাকারবারিদের হাতেনাতে ধরিয়ে দেওয়া।
কিন্তু সাংবাদিকরা কল্পনাও করতে পারেননি, তারা যাকে রক্ষক ভেবে তথ্য দিচ্ছেন, তিনি নিজেই হতে চলেছেন ভক্ষক। বিজিবি কমান্ডারের কাছে যখন এই সুনির্দিষ্ট তথ্য পৌঁছায়, তখন তিনি এক অদ্ভুত কৌশলের আশ্রয় নেন। তিনি সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করে বলেন, "অবশ্যই ধরা হবে।" কিন্তু তার একটি শর্ত ছিল। তিনি দাবি করেন, বিজিবির নিয়মিত টহল টিমের ওপর তার সন্দেহ রয়েছে। টহল টিম সাথে থাকলে খবর পাচার হয়ে যেতে পারে—এই অজুহাতে তিনি টহল টিম ছাড়াই অভিযানে যাওয়ার নাটক সাজান।
বাস্তবে এটি ছিল এক সুদূরপ্রসারী চাল। সাংবাদিকদের চোখে ধুলো দিয়ে এবং টহল টিমকে দূরে রেখে তিনি মূলত চোরাকারবারিদের জন্য এক ‘সেফ এক্সিট’ বা নিরাপদ পথ তৈরি করে দিচ্ছিলেন। যখন আকাবপুর আর খিরনালের নির্জন পথে ৫টি মালবোঝাই গাড়ি সীমান্ত অতিক্রম করছিল, তখন এই কর্মকর্তা সাংবাদিকদের ব্যস্ত রাখছিলেন নানা অজুহাতে।
সেই রাতের অন্ধকার ঘটনার পর ফাঁস হয়ে যায় বিজিবি কমান্ডারের সাথে সাংবাদিকদের কথোপকথনের এক চাঞ্চল্যকর অডিও রেকর্ড। এই অডিও রেকর্ডটিই এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে অপরাধের অকাট্য দলিল।
কথোপকথনে শোনা যায়, সাংবাদিকরা যখন বারবার জিজ্ঞেস করছেন চোরাচালানের অগ্রগতি কী, তখন কমান্ডার কৌশলে বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তিনি উল্লেখ করছেন মিজান হ্যাচারি আর মাস্টার রুমের পাশের এলাকাগুলোর কথা। যেখানে তিনি দাবি করছেন তার লোক মোতায়েন ছিল, অথচ সেই পয়েন্টগুলো দিয়েই নির্বিঘ্নে পার হয়ে গেছে অবৈধ পণ্যের গাড়ি। নার্সারি এলাকায় লোক বসিয়ে রাখার যে তথ্য তিনি দিচ্ছিলেন, তা ছিল কেবলই এক সাজানো নাটক।
সাংবাদিকরা অডিওতে বারবার দাবি করছেন যে, তথ্য দেওয়ার সাথে সাথে বর্ডারে খবর পৌঁছে গেছে। অর্থাৎ, বিজিবির ভেতর থেকেই কেউ চোরাকারবারিদের আগেভাগে সাবধান করে দিয়েছিল। ৫টি বড় বড় গাড়ি পণ্য নিয়ে সীমান্ত পার হয়ে গেল, অথচ কমান্ডারের ভাষায়—তিনি কিছুই টের পাননি! এটি কি নিছক অবহেলা, নাকি পরিকল্পিত সহায়তা?
এই ৫টি গাড়িতে কী ছিল? হয়তো ছিল মরণনেশা ফেনসিডিল, ইয়াবা কিংবা হেরোইন। হয়তো ছিল শুল্ক ফাঁকি দেওয়া কোটি কোটি টাকার ভারতীয় কাপড় ও কসমেটিকস। এই পণ্যগুলো যখন এদেশের বাজারে ছড়িয়ে পড়বে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমাদের দেশীয় শিল্প, ধ্বংস হবে আমাদের যুবসমাজ। আর এই ধ্বংসের মূলে জ্বালানি জোগাচ্ছেন তারাই, যাদের হাতে দেশ রক্ষার দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে।
কসবার আকাবপুর থেকে ধজনগর—এই বিস্তীর্ণ সীমান্ত পথটি কি তবে চোরাচালানের অভয়রণ্য হয়ে উঠেছে? একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার এমন বিমাতাসুলভ আচরণ এবং সাংবাদিকদের সাথে করা এই ‘ডাবল গেম’ আজ অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যখন একজন সাংবাদিক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে প্রশাসনের হাতে তুলে দেয়, তখন সেই তথ্যের সাথে বিশ্বাসভঙ্গ করা মানে পুরো দেশের সাথে বেইমানি করা।
বিজিবি একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। কয়েকজনের লালসার কারণে এই সুশৃঙ্খল বাহিনীর সম্মান ধূলিসাৎ হতে পারে না। এই ঘটনার পর জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এলাকার সাধারণ মানুষ এখন জানতে চায়—একজন কমান্ডারের পক্ষে একা কি এত বড় পাচার সম্ভব? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে আরও রাঘববোয়াল?
সীমান্তের রক্ষক যখন ভক্ষক হয়, তখন দেশের সার্বভৌমত্ব আর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। তালাশ ক্রাইম দৃষ্টি টিম সত্যের এই লড়াইয়ে পিছপা হবে না। ফাঁস হওয়া অডিও এবং পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণ এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টেবিলে। আমরা আশা করি, এই বিশ্বাসঘাতকতার সুষ্টু তদন্ত হবে। কসবার সীমান্ত দিয়ে যারা মাদক আর অবৈধ পণ্যের জোয়ার বইয়ে দিচ্ছে, তাদের সাথে জড়িত সকল পর্দার অন্তরালের নায়কদের মুখোশ উন্মোচন করা হবে।
মনে রাখতে হবে, সীমান্ত রক্ষা মানে কেবল একটি রেখা রক্ষা করা নয়, এটি একটি দেশের মানচিত্র এবং তার ভবিষৎ রক্ষা করা। মাদক ও চোরাচালান মুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে আগে ঘরের শত্রুদের চিহ্নিত করতে হবে। বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে সেইসব মুখোশধারী দেশপ্রেমিকদের, যারা অর্থের বিনিময়ে নিজের ইউনিফর্মের পবিত্রতাকে বলি দিচ্ছে
চেয়ারম্যান: মিঠু মিয়া, ব্যবস্থাপনাপরিচালক: দ্বীন ইসলাম , বার্তা সম্পাদক: ফয়সাল সিকদার
তালাশ ক্রাইম দৃষ্টি