
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
ব্রাহ্মণবাড়িয়া: "বেড়ায় যদি ক্ষেত খায়, তবে ক্ষেত রক্ষা করবে কে?"—প্রবাদটি যেন এখন ব্রাহ্মণবাড়িয়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) ক্ষেত্রে চরম বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। যেখানে মাদকের মরণছোবল থেকে যুবসমাজকে রক্ষার দায়িত্ব সংস্থাটির ওপর, সেখানে খোদ অধিদপ্তরের এক সদস্যের বিরুদ্ধে উঠেছে মাদক সেবন এবং কারবারিদের কাছ থেকে নিয়মিত 'মাসোহারা' ও লক্ষাধিক টাকার ঘুষ আদায়ের গুরুতর অভিযোগ। অভিযুক্ত এই সদস্য হলেন—কনস্টেবল সাখাওয়াত।
চার বছরের রাজত্ব: একই স্থানে খুঁটি গেড়ে বসা 'প্রভাবশালী' সাখাওয়াত
সরকারি চাকরিতে সাধারণত তিন বছর অন্তর বদলির নিয়ম থাকলেও রহস্যজনক এক ক্ষমতার জোরে গত চার বছর ধরে একই কর্মস্থলে (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) দাপটের সাথে কাজ করছেন সাখাওয়াত। অনুসন্ধানে জানা গেছে, তার স্থায়ী নিবাস পার্শ্ববর্তী কুমিল্লা জেলার দেবিদ্বার থানায়। নিজ জেলা থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন থাকার সুযোগে তিনি গড়ে তুলেছেন অপরাধের এক অভেদ্য দুর্গ। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, সাখাওয়াত মাদক নির্মূলের চেয়ে মাদক কারবারিদের সাথে 'সখ্যতা' গড়ে তুলতেই বেশি আগ্রহী।
দেড় লক্ষ টাকার 'ঘুষ বাণিজ্য' ও মাসোহারার মহোৎসব
'তালাশ ক্রাইম দৃষ্টি'-র হাতে আসা ডিজিটাল প্রমাণ এবং হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা থেকে সাখাওয়াতের সীমাহীন দুর্নীতির চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, সাখাওয়াত কসবার মাদক স্পটগুলো থেকে নিয়মিত মাসিক ভিত্তিতে অনেক টাকা তোলেন। এছাড়া কসবা ও নবীনগর এলাকায় 'আখাউড়া-গঞ্জ' নামক এক বিশেষ মাধ্যমের সাহায্যে সাখাওয়াত বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, সম্প্রতি দুটি গাড়ি আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে একজন গাঁজা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সাখাওয়াত সরাসরি ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা ঘুষ গ্রহণ করেছেন। সূত্র বলছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে তিনি এমন অসংখ্য ডিলের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ কামিয়েছেন এবং বর্তমানে তার অবস্থান কুমিল্লা দেবিদ্বার থানায় বলে জানা গেছে।
তালাশ ক্রাইম দৃষ্টির মুখোমুখি: তর্কের পর স্বীকারোক্তি
সাখাওয়াতের এই অনিয়ম নিয়ে যখন 'তালাশ ক্রাইম দৃষ্টি'-র প্রতিনিধিরা সরাসরি তার মুখোমুখি হন, তখন তিনি শুরুতে চরম ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করেন। তবে দীর্ঘ আলাপচারিতা, একের পর এক তথ্যপ্রমাণ এবং ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা ঘুষ লেনদেনের অকাট্য প্রমাণের মুখে তার যাবতীয় দম্ভ চুরমার হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে চলা বিতর্ক ও যুক্তির মুখে সাখাওয়াত তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো স্বীকার করতে বাধ্য হন।
তার স্বীকারোক্তি ও অনুসন্ধানে প্রাপ্ত মূল পয়েন্টগুলো:
আখাউড়া ও কসবা কানেকশন: সাখাওয়াত কসবা ও আখাউড়া উপজেলার বিভিন্ন মাদক স্পট থেকে নিয়মিত সাপ্তাহিক ও মাসিক বখরা বা মশুহারা তোলেন।
বড় অংকের ঘুষ বাণিজ্য: গাড়ি আটক বা মাদক ব্যবসায়ীদের মামলার ভয় দেখিয়ে দেড় লক্ষ টাকার মতো মোটা অংকের টাকা আদায় করেন।
প্রভাব বিস্তার: কুমিল্লা জেলার দেবিদ্বারের বাসিন্দা হওয়ায় সাখাওয়াত ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে তার প্রভাব কাজে লাগিয়ে এই বাণিজ্য চালিয়ে আসছেন।
নিজেদের সেবন: মাদক উদ্ধারের অভিযানে গিয়ে জব্দকৃত মাদকের একটি অংশ তিনি নিজের সেবনের জন্য সরিয়ে রাখেন।
স্থানীয়দের ক্ষোভ ও কর্তৃপক্ষের নীরবতা
আখাউড়া ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা জানান, এই কর্মকর্তার দাপটে প্রকৃত মাদক বিরোধী অভিযান মুখ থুবড়ে পড়েছে। একজন কনস্টেবল চার বছর ধরে একই জেলায় বহাল তবিয়তে থেকে কীভাবে এমন অপরাধী চক্র গড়ে তুললেন, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। মাদক সেবন ও ঘুষ গ্রহণের মতো গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত সাখাওয়াতের বিরুদ্ধে এখনই বিভাগীয় তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
অনুসন্ধানী দৃষ্টি: তালাশ ক্রাইম দৃষ্টির পর্যবেক্ষণ
তদন্ত সাংবাদিকতার জায়গা থেকে বলা যায়, সাখাওয়াতের এই অপরাধ কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এটি একটি কাঠামোগত দুর্নীতির অংশ। যখন সরকারি পাহারাদাররা নিজেই মাদকের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে এবং অপরাধীদের ডেরায় গিয়ে মাসোহারা আদায় করে, তখন মাদক নির্মূল অভিযান কেবল একটি লোক দেখানো নাটকে পরিণত হয়। সাখাওয়াতের মতো ব্যক্তিরা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মতো একটি সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে থাকা মানে হলো বিষধর সাপকে দুধ-কলা দিয়ে পোষা।
উপসংহার:
'সরষের ভেতর ভূত' তাড়াতে না পারলে মাদকমুক্ত সমাজ গড়া অসম্ভব। সাখাওয়াতের মতো অসাধু কর্মীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনাই এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কসবার মতো গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকাগুলোতে মাদকের শিকড় উপড়ে ফেলা কখনোই সম্ভব হবে না। তালাশ ক্রাইম দৃষ্টি সত্য প্রকাশে আপসহীন এবং এই ঘটনার শেষ দেখে ছাড়বে
চেয়ারম্যান: মিঠু মিয়া, ব্যবস্থাপনাপরিচালক: দ্বীন ইসলাম , বার্তা সম্পাদক: ফয়সাল সিকদার
তালাশ ক্রাইম দৃষ্টি