নিজস্ব প্রতিবেদক, কুমিল্লা
এলাকা জুড়ে আতঙ্ক ও প্রশাসনের নির্লিপ্ততা জিলানী ও তার পার্টনার রফিকের মাদক সাম্রাজ্যের বিস্তারের কারণে ব্রাহ্মণপাড়ার সাধারণ মানুষ এখন মুখ খুলতে ভয় পায়
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলায় মাদক ও অপরাধ জগতের সংবাদ প্রকাশ করায় সাংবাদিক দ্বীন ইসলামের কণ্ঠরোধ করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে এক প্রভাবশালী মাদক সিন্ডিকেট। গত ৫ই আগস্টের পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলালেও উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নে মাদক সম্রাট জিলানী ও তার সহযোগীদের দাপট কমেনি। উল্টো পেশাদার সাংবাদিকদের মিথ্যা চাঁদাবাজি মামলায় ফাঁসিয়ে এলাকা ছাড়া করার পরিকল্পনা করছে তারা।
আজ (২৬ ডিসেম্বর) কুখ্যাত মাদক কারবারি জিলানী সাংবাদিক দ্বীন ইসলামকে সরাসরি ফোন করে পুনরায় নতুন করে চাঁদাবাজি মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি প্রদান করে। এই ঘটনায় স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী এবং সচেতন মহলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নিরাপত্তার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
হুমকির নেপথ্যে: সত্য বনাম সিন্ডিকেট
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ১২ মে ২০২৫ তারিখে সাংবাদিক দ্বীন ইসলাম এবং তার সহকর্মীরা মাধবপুর এলাকায় মাদক ব্যবসা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে পরিকল্পিতভাবে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। জিলানী ও তার সহযোগীরা ‘জিলানী পরিবহন এন্ড মৎস্য আড়ৎ’-এ সাংবাদিকদের ডেকে নিয়ে আটকে রেখে মারধর করে এবং পরবর্তীতে ওসিকে মোটা অংকের টাকা দিয়ে ফোন করে পুলিশ ডেকে তাদের ‘চাঁদাবাজ’ হিসেবে তুলে দেয়।
ভুয়া মামলার সেই ট্র্যাজেডি কাটিয়ে না উঠতেই আজ পুনরায় জিলানী টেলিফোনে হুমকি দিয়ে বলে, “বেশি বাড়াবাড়ি করলে আগের চেয়েও ভয়ংকর মামলায় ফাঁসানো হবে।” অপরাধীদের এমন আস্ফালন প্রমাণ করে যে, নেপথ্যে বড় কোনো শক্তির মদদপুষ্ট হয়ে তারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে।
সাজানো নাটকের ব্যবচ্ছেদ: ১২ মে’র সেই ঘটনা
গত ১২/০৫/২৫ইং তারিখ রাত আনুমানিক ৮টার দিকে মাধবপুর বাস স্ট্যান্ড এলাকায় জিলানীর আড়তে যা ঘটেছিল, তা ছিল মূলত একটি পূর্বপরিকল্পিত ফাঁদ। স্থানীয় সূত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী:
আক্রমণের প্রস্তুতি: সাংবাদিক দ্বীন ইসলাম ও মোঃ সবুর খান যখন জিলানীর অপরাধের তথ্য পাচ্ছিলেন, তখন তাদের আপোষ করার প্রস্তাব দিয়ে আড়তে ডাকা হয়।নির্মম নির্যাতন: দ্বীন ইসলাম সবুর খান ইউপি মেম্বার মিঠু মিয়া তিনজনকে আসামি করেন জিলানী খান মেম্বারসহ মামলার আসামি করা হয় অজ্ঞাতনামা ক্যাডাররা উপস্থিত হয়ে সাংবাদিকদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।
গণপিটুনির নাটক: মাদক ব্যবসায়ীদের পালিত ক্যাডারদের দিয়ে ‘গণপিটুনি’র নাটক সাজানো হয় যাতে পুলিশের কাছে বিষয়টিকে বিশ্বাসযোগ্য করা যায়।
পুলিশি হস্তক্ষেপ: ৯৯৯-এর কল ব্যবহার করে অপরাধীরা নিজেদের ‘শিকার’ হিসেবে উপস্থাপন করে এবং সাংবাদিকদের ‘আসামি’ বানিয়ে পুলিশের হাতে সোপর্দ করে। এই ঘটনার পর থেকেই জিলানী সিন্ডিকেট এলাকায় প্রচার করতে থাকে যে, কেউ তাদের বিরুদ্ধে কথা বললে একই দশা হবে।
কে এই জিলানী? অপরাধের ফিরিস্তি
জিলানী (২৮), পিতা: লিয়াকত আলী, সাং-মাধবপুর। বাহ্যিকভাবে তিনি মাছ ব্যবসায়ী ও পরিবহন মালিক পরিচয় দিলেও তার আসল আয়ের উৎস মাদক চোরাচালান। এলাকাবাসী জানায়, জিলানী মূলত সাবেক এমপি আবু জাহেরের অনুসারী এবং মাধবপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের বিতর্কিত নেতা দৌলত খার বিশ্বস্ত সহযোগী।
জিলানীর অপরাধ সাম্রাজ্যের প্রধান দিকগুলো হলো: ১. মাদক সিন্ডিকেট: সীমান্ত এলাকা দিয়ে ফেনসিডিল, ইয়াবা ও আইস দেশে প্রবেশ করানোর অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক তিনি। ২. পরিবহন ও লজিস্টিক: তার মালিকানাধীন ‘জিলানী পরিবহন’ এবং নামসর্বস্ব মৎস্য আড়ত মূলত মাদক মজুত ও পরিবহনের আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ৩. কিশোর গ্যাং ও অস্ত্র: জিলানী এলাকায় একটি সুসংগঠিত কিশোর গ্যাং লালন-পালন করেন। এদের কাজ হলো মাদকের চালান পাহারা দেওয়া এবং প্রতিবাদকারীদের ওপর হামলা করা। ৪. নারীর শ্লীলতাহানি ও অসামাজিক কাজ: তার বিরুদ্ধে নারীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অসামাজিক কাজে বাধ্য করার এবং গোপন ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করার অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে।
সাংবাদিককে কেন টার্গেট করা হচ্ছে?
ব্রাহ্মণপাড়ার সাংবাদিকরা যখন জিলানী,লেখক খান ও দৌলত খাঁ’র এই মাদক সাম্রাজ্যের ওপর সংবাদ প্রকাশ করতে শুরু করেন, তখন থেকেই তারা চক্ষুশূলে পরিণত হন। বিশেষ করে দ্বীন ইসলাম যখন জিলানীর মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত বিলাসবহুল ‘টিআরএক্স’ (TRX) গাড়ি এবং প্রাইভেট কারের রুটগুলো উন্মোচন করার চেষ্টা করেন, তখনই তাকে দমানোর জন্য এই মিথ্যা মামলার জাল বোনা হয়।
একজন সংবাদকর্মীকে মিথ্যা চাঁদাবাজি মামলায় ফাঁসানো মানে হলো একটি সত্য কণ্ঠকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া। জিলানী আজ ফোনে হুমকি দিয়ে মূলত এটিই নিশ্চিত করতে চেয়েছে যে, তার অপরাধ নিয়ে আর কোনো নিউজ প্রকাশ করা যাবে না।
দৌলত খা ও আবু জাহেরের অদৃশ্য হাত
ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর এমপি আবু জাহের আত্মগোপনে থাকলেও তার ক্যাডার বাহিনী এখনো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। আওয়ামী লীগ নেতা
দৌলত খা নেপথ্যে থেকে জিলানীকে আইনি ও প্রশাসনিক সুরক্ষা দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। লেখ তালি ও দৌলত খাঁ’র নির্দেশেই জিলানী সাংবাদিকদের ওপর হামলা করার সাহস পায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাধবপুরের এক প্রবীণ ব্যক্তি বলেন, “জিলানীরা তো শুধু দাবার গুটি। আসল চাল চালছে সুন্দর আলীর ছেলে দৌলত খা । এরা মাদকের টাকা দিয়ে প্রশাসন থেকে শুরু করে অনেক প্রভাবশালীকেই ম্যানেজ করে রাখে। তাই তো সাংবাদিক পেটানোর পরও জিলানী আজ আবার ফোন করে হুমকি দেওয়ার সাহস পায়।”
এলাকা জুড়ে আতঙ্ক ও প্রশাসনের নির্লিপ্ততা জিলানী ও তার পার্টনার রফিকের মাদক সাম্রাজ্যের বিস্তারের কারণে ব্রাহ্মণপাড়ার সাধারণ মানুষ এখন মুখ খুলতে ভয় পায়।
রফিক (পিতা: কাসেম মিয়া) মূলত জিলানীর বিপণন ও সরবরাহ নেটওয়ার্ক দেখাশোনা করেন। এই সিন্ডিকেটের হাত এতই লম্বা যে, থানায় অভিযোগ দিলেও অনেক সময় তা আমলে নেওয়া হয় না বলে ভুক্তভোগীদের দাবি।
বারবার মিথ্যা মামলার শিকার হওয়া সাংবাদিকদের জীবন এখন চরম ঝুঁকির মুখে। দ্বীন ইসলামকে দেওয়া আজকের হুমকি কেবল একজন ব্যক্তির ওপর নয়, বরং পুরো মুক্ত সাংবাদিকতার ওপর বড় আঘাত।
পেশাজীবী মহলের প্রতিক্রিয়া
সাংবাদিককে মাদক ব্যবসায়ীর হুমকির তীব্র নিন্দা জানিয়ে ব্রাহ্মণপাড়া ও কুমিল্লার সাংবাদিক সংগঠনগুলো বিবৃতি দিয়েছে। তারা অবিলম্বে জিলানীকে গ্রেফতার এবং ১২ মে’র সাজানো মামলার পুনঃতদন্তের দাবি জানিয়েছেন। সাংবাদিক নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, অপরাধীদের দমন না করা হলে কঠোর কর্মসূচি পালন করা হবে।
উপসংহার ও দাবি
একটি সভ্য সমাজে মাদক ব্যবসায়ীদের হাতে সাংবাদিকদের হেনস্তা হওয়া চরম লজ্জার বিষয়। সাংবাদিক দ্বীন ইসলামকে পুনরায় মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর যে হুমকি জিলানী দিয়েছে, তার অডিও রেকর্ড ও প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ প্রশাসনের কাছে পেশ করা জরুরি। সরকারের নিকট এলাকাবাসীর দাবি:নঅবিলম্বে মাদক সম্রাট জিলানী, রফিক এবং তাদের আশ্রয়দাতা লিয়াকত আলী,ও দৌলত খাঁকে গ্রেফতার করতে হবে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সাজানো ও মিথ্যা চাঁদাবাজি মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।
মাধবপুর এলাকায় মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত তথাকথিত ‘মৎস্য আড়ত’ ও পরিবহন সেক্টরে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে অভিযান চালাতে হবে।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং মাদক ও অপরাধমুক্ত সমাজ গড়তে হলে এই সিন্ডিকেটের বিষদাঁত এখনই উপড়ে ফেলা প্রয়োজন। নতুবা কলম যোদ্ধারা যদি সত্য লিখতে গিয়ে বারবার কারাগারে যায়, তবে সমাজ অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।
তদন্ত প্রতিবেদন: এই সংবাদটি ভুক্তভোগীর সরাসরি অভিযোগ এবং স্থানীয় অনুসন্ধানের ভিত্তিতে তৈরি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত বিষয়টির যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা
মন্তব্য করুন