প্রতিবেদক: নিজস্ব প্রতিবেদক
সাব-হেডিং: পুলিশের অভ্যন্তরীণ ডাটাবেজ (CDMS) থেকে স্পর্শকাতর তথ্য লিক এবং তা হুবহু প্রকাশের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সাইবার নিরাপত্তা আইনের গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।
ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট বলছে, পুলিশের কোনো দায়িত্বশীল সূত্র থেকেই ফাঁস হয়েছে এই তথ্য।
সত্য উন্মোচনের অংশ হিসেবে সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো জনস্বার্থ রক্ষা ও বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখা। কিন্তু সম্প্রতি কসবা টিভি নামক একটি স্থানীয় নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত একটি সংবাদে সাংবাদিকতার নৈতিকতা এবং রাষ্ট্রীয় সাইবার নিরাপত্তা আইনের চরম লঙ্ঘনের চাঞ্চল্যকর প্রমাণ পাওয়া গেছে। কথিত এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সংবাদ পরিবেশন করতে গিয়ে ওই গণমাধ্যমটি বাংলাদেশ পুলিশের অত্যন্ত সুরক্ষিত ‘ক্রিমিনাল ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ (CDMS)-এর অভ্যন্তরীণ নথিপত্র এবং ওই ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) অনুলিপি হুবহু প্রকাশ করেছে।
এই ঘটনাটি কেবল ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি রাষ্ট্রের অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্যভাণ্ডারের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার প্রশ্ন
প্রকাশিত নথির ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, নথির নিচের অংশে একটি সুস্পষ্ট ইউআরএল (URL) https://cdms.police.gov.bd/cdms/… এবং একটি টাইমস্ট্যাম্প 12/28/2025, 12:01 PM দৃশ্যমান।
যেহেতু CDMS সাধারণ নাগরিক বা সাংবাদিকদের জন্য উন্মুক্ত নয়, তাই এই ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে—২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ দুপুর ১২টা বেজে ০১ মিনিটে পুলিশের কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা তার নিজস্ব ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে এই সিস্টেমে প্রবেশ করেছেন এবং এই পিডিএফ বা প্রিন্ট কপিটি বের করে সংবাদমাধ্যমকে সরবরাহ করেছেন। আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ বা আনুষ্ঠানিক তদন্তের বাইরে গিয়ে একজন ‘সন্দিগ্ধ’ (Suspected) বা ‘অভিযুক্ত’ (Accused) ব্যক্তির সিডিএমএস রেকর্ড এভাবে জনসমক্ষে ফাঁস করা পুলিশ রেগুলেশনস বেঙ্গল (PRB) এবং অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
গুরুতর আইনি লঙ্ঘন
কসবা টিভির উক্ত প্রতিবেদনে যে বিষয়গুলো সরাসরি প্রচলিত আইনের পরিপন্থী বলে প্রতীয়মান হচ্ছে:
সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ লঙ্ঘন: CDMS রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি ‘সংরক্ষিত সিস্টেম’ (Protected System) বা ক্রিটিক্যাল ইনফরমেশন ইনফ্রাস্ট্রাকচার (CII)। এই আইন অনুযায়ী, সংরক্ষিত সিস্টেম থেকে অননুমোদিতভাবে তথ্য সংগ্রহ এবং ডিজিটাল মাধ্যমে তা প্রচার করা একটি জামিন অযোগ্য অপরাধ।
ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা লঙ্ঘন (Data Privacy): সাইবার নিরাপত্তা আইনের ২৬ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির সম্মতি ছাড়া তার আইডেন্টিটি ইনফরমেশন (যেমন: জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্মতারিখ, বায়োমেট্রিক ডেটা বা হুবহু ঠিকানা) প্রকাশ করা আইনত দণ্ডনীয়। ব্যক্তি অপরাধী হিসেবে সন্দেহভাজন হলেও, আদালত কর্তৃক চূড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত তার এই ব্যক্তিগত তথ্যগুলো সুরক্ষার অধিকার রয়েছে।
মানহানি ও অপেশাদারিত্ব: পেনাল কোডের ৪৯৯ ও ৫০০ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে সামাজিকভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যে (আদালতে প্রমাণিত হওয়ার আগেই) তাকে অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করে এহেন গোপন নথি প্রকাশ করা ফৌজদারি মানহানির শামিল। নথির সংবেদনশীল তথ্য (যেমন: NID নম্বর, URL) ব্লার (Blur) বা রিডাক্ট (Redact) না করে হুবহু প্রকাশ করা সাংবাদিকতার সাধারণ রীতিনীতিরও চরম পরিপন্থী।
পর্দার আড়ালের সত্য: নাগরিকদের তথ্য কতটা নিরাপদ?
এই ঘটনাটি কেবল একটি নির্দিষ্ট সংবাদমাধ্যমের অপেশাদারিত্বের প্রমাণ নয়, বরং এটি প্রাতিষ্ঠানিক ত্রুটির একটি বড় উদাহরণ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভেতরের কোনো অসাধু চক্র যদি ব্যক্তিগত আক্রোশ বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রীয় তথ্যভাণ্ডারকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তবে সাধারণ নাগরিকদের তথ্যের নিরাপত্তা কোথায়?
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত উল্লেখিত টাইমস্ট্যাম্প ও ডিজিটাল প্রমাণের ভিত্তিতে সিডিএমএস সিস্টেমে ওই নির্দিষ্ট সময়ে প্রবেশকারীকে শনাক্ত করে দ্রুত বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা। একই সাথে, বেআইনিভাবে প্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় গোপন নথি জনসমক্ষে প্রকাশ করার দায়ে সংশ্লিষ্ট প্রকাশক ও সম্পাদকের আইনি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করাও জরুরি। প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে এ ধরনের সাইবার নিরাপত্তা লঙ্ঘন ও চরিত্রহননের ঘটনা ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
মন্তব্য করুন