নিজস্ব প্রতিবেদক : দ্বীন ইসলাম
আর এই অভয়ারণ্যের অঘোষিত রাজা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে কুখ্যাত মাদক সম্রাট জসিম মিয়া, এলাকায় যাকে সবাই ‘কালো জসিম’ বা ‘জসিম কসাই’ নামে চেনে। তবে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক ভয়ংকর তথ্য—জসিম একা নয়, বরং তার ভাই এবং এক বোনকে নিয়ে গড়ে তুলেছে একটি শক্তিশালী ‘পারিবারিক মাদক সিন্ডিকেট’। প্রতিদিন এই চক্রের মাধ্যমে কয়েক লক্ষ টাকার মাদক কেনাবেচা হলেও রহস্যজনক কারণে নীরব ভূমিকা পালন করছে স্থানীয় প্রশাসন।
পারিবারিক সিন্ডিকেটে মাদকের হাট
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিঙ্গারবিল ইউনিয়নের কাশিনগর গ্রামের এই জসিম মিয়া তার মাদকের সাম্রাজ্য পরিচালনায় পরিবারের সদস্যদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। জসিম নিজে মূল সরবরাহকারী এবং ডিলার হিসেবে কাজ করলেও, মাঠ পর্যায়ে মাদক মজুদ ও বিক্রির তদারকি করে তার আপন ভাই। শুধু তাই নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে তার এক বোনকেও এই ব্যবসায় সক্রিয়ভাবে নামানো হয়েছে। নারীদের মাধ্যমে মাদক পরিবহন ও লেনদেন করা সহজ—এই কৌশলী পথ বেছে নিয়েই জসিম সিন্ডিকেট আজ অপ্রতিরোধ্য।
বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, এই পারিবারিক চক্রটি প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৫ লক্ষ টাকার নেশাজাতীয় ‘স্কার্ফ’ (Scarf) সিরাপ, ফেনসিডিল এবং মরণঘাতী ইয়াবা পাইকারি ও খুচরা বিক্রি করে। মাসের হিসেবে এই লেনদেনের পরিমাণ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। স্থানীয়দের ভাষায়, “জসিমের বাড়িতে প্রতিদিন মাদকের হাট বসে, আর তার ভাই-বোন সেই হাটের ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজ করে।”
প্রশাসনের নীরব ভূমিকা: রহস্য কোথায়?
সবচেয়ে বড় বিস্ময়ের বিষয় হলো, কুখ্যাত মাদক সম্রাট কালো জসিমের বিরুদ্ধে বর্তমানে ৬টি মাদক মামলার ওয়ারেন্ট রয়েছে। আইন অনুযায়ী একজন ওয়ারেন্টভুক্ত আসামী পলাতক থাকার কথা থাকলেও, জসিমকে নিয়মিত বিজয়নগর ও সিঙ্গারবিলের বিভিন্ন জনসমাগমস্থলে দাপিয়ে বেড়াতে দেখা যায়। এমনকি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সামনে দিয়ে সে বুক ফুলিয়ে চলাফেরা করে।
অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় প্রশাসনের একটি বিশেষ অংশ জসিমের এই অবৈধ আয়ের ভাগ পায়। ‘ম্যানেজ’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জসিম তার বিরুদ্ধে থাকা ওয়ারেন্টগুলোকে কার্যত অকেজো করে রেখেছে। সিঙ্গারবিলের প্রতিটি মাদকের স্পটে জসিমের পাইকারি সাপ্লাই থাকলেও সেখানে কোনো কার্যকর অভিযান না হওয়া প্রশাসনের পেশাদারিত্বকে বড় ধরণের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—পুলিশ কি জসিমের চেয়েও দুর্বল, নাকি জসিমের মাদকের টাকায় প্রশাসনের একাংশের হাত রঞ্জিত?
সাধারণ মানুষের প্রাণভয়
নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সূত্র তালাশ ক্রাইম দৃষ্টি কে জানিয়েছে, জসিম ও তার পরিবারের অত্যাচারে কাশিনগর ও আশেপাশের মানুষ আজ জিম্মি। সূত্রটি আবেগাপ্লুত হয়ে জানায়, “ভাই, আমরা সাধারণ মানুষ হিসেবে আপনার কাছে অনুরোধ করছি—তাদের আইনের আওতায় আনুন। মাদক দেশ ও জাতিকে ধ্বংস করছে। আমরা আমাদের মাতৃভূমিকে ভালোবাসি এবং একে রক্ষা করতে চাই।”
সরেজমিনে তদন্তে দেখা গেছে, জসিমের একটি নিজস্ব ‘লাঠিয়াল বাহিনী’ রয়েছে। যদি এলাকার কোনো সচেতন নাগরিক এই মাদক ব্যবসার প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেন, তবে জসিমের ভাই ও তার বাহিনীর সদস্যরা তাদের ওপর চড়াও হয়। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশের কিছু অসাধু সদস্যের সহায়তায় প্রতিবাদকারীদের উল্টো মিথ্যা মাদক মামলায় ফাঁসিয়ে জেল খাটানো হয়। এই ‘মিথ্যা মামলার’ ভয়েই এলাকার সাধারণ মানুষ এখন জসিমের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পায় না।
সীমান্তের রুট ও মাদকের বিস্তার
বিজয়নগরের সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারত থেকে অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ স্কার্ফ সিরাপ ও ফেনসিডিল নিয়ে আসা হয়। জসিমের ভাই ও বোনের তত্ত্বাবধানে সেই মাদকগুলো বিভিন্ন গোপন আস্তানায় ও পুকুরপাড়ে মজুদ করা হয়। এরপর সেখান থেকে সিঙ্গারবিল ইউনিয়নের ছোট-বড় প্রতিটি স্পটে তা সরবরাহ করা হয়। প্রতিদিন কয়েক হাজার তরুণ এই বিষাক্ত ছোবলে আক্রান্ত হচ্ছে, কিন্তু প্রতিকারের কোনো লক্ষণ নেই
মন্তব্য করুন