নিজস্ব প্রতিবেদক
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমান্তবর্তী উপজেলা কসবা। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দীর্ঘকাল ধরেই এই অঞ্চলটি মাদক ও ভারতীয় পণ্য চোরাচালানের ‘ট্রানজিট পয়েন্ট’ হিসেবে পরিচিত।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই অপরাধ জগতে এসেছে আমূল পরিবর্তন। সনাতন পদ্ধতির বদলে এখন কসবার মাদক ও চোরাচালান সিন্ডিকেট পরিচালিত হচ্ছে সম্পূর্ণ আধুনিক ও ডিজিটাল পদ্ধতিতে। গোয়েন্দা বাহিনীর নজরদারি এড়াতে এবং নিজেদের অপারেশন নিশ্ছিদ্র করতে তারা ব্যবহার করছে অত্যাধুনিক ওয়াকিটোকি এবং এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ মাধ্যম।
সম্প্রতি ‘তালাশ ক্রাইম দৃষ্টি’-র অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এই ভয়ঙ্কর ডিজিটাল সিন্ডিকেটের চাঞ্চল্যকর তথ্য।
নেপথ্যে নতুন নেতৃত্ব: বাদশাহ জুয়েল ও শাকিলের উত্তরসূরি
কসবার একসময়ের শীর্ষ মাদক সম্রাট হিসেবে পরিচিত বাদশাহ জুয়েল এবং দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী লায়ন শাকিল বর্তমানে দৃশ্যপটে অনুপস্থিত থাকলেও তাদের গড়ে তোলা সাম্রাজ্য থেমে নেই।
এই শূন্যস্থান পূরণে উঠে এসেছে নতুন প্রজন্মের ‘গ্যাং লিডার’। বর্তমানে কসবার মাদক সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ এখন হৃদয় চৌধুরীর হাতে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, হৃদয় চৌধুরীর প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন সরোয়ার আলম। এই দুর্ধর্ষ জুটি মাদকের কারবারকে কেবল পেশি শক্তির ওপর টিকিয়ে না রেখে একে একটি প্রযুক্তিগত কাঠামোর ওপর দাঁড় করিয়েছে। তারা কসবা সীমান্তকে এমনভাবে নেটওয়ার্কিংয়ের আওতায় এনেছে যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিটি পদক্ষেপ তাদের নখদর্পণে থাকে।
ওয়াকিটোকি অপারেশন: গোয়েন্দা নজরদারিতে ফাঁকি
এই সিন্ডিকেটের সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং বিপজ্জনক দিক হলো তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা।
‘তালাশ ক্রাইম দৃষ্টি’-র হাতে আসা গোপন তথ্য ও সূত্র অনুযায়ী, চিহ্নিত এই মাদক চক্রটি ভারত থেকে ঢাকা পর্যন্ত মাদক পৌঁছে দেওয়ার দীর্ঘ রুট নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করছে প্রায় ১০ থেকে ১৫টি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ওয়্যারলেস ওয়াকিটোকি সেট।
কেন তারা ওয়াকিটোকি বেছে নিয়েছে? ট্র্যাকিং এড়ানো: সাধারণ মোবাইল ফোনে কথোপকথন রেকর্ড হওয়ার বা লোকেশন ট্র্যাক হওয়ার ভয় থাকে। কিন্তু নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সির ওয়াকিটোকিতে কথা বললে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাধারণ নজরদারিতে তা ধরা পড়ে না।
তাৎক্ষণিক সংকেত: সীমান্ত থেকে যখন মাদকের চালান তারকাঁটা পার হয়, তখন পাহারায় থাকা সদস্যরা কোড ল্যাঙ্গুয়েজে ওয়াকিটোকিতে সংকেত পাঠায়। এতে সেকেন্ডের মধ্যে পুরো রুট ‘ক্লিয়ার’ কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়।
নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন এলাকা: সীমান্তের অনেক গভীর এলাকা বা পাহাড়ি এলাকায় মোবাইলের টাওয়ার না থাকলেও ওয়াকিটোকি নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিত করে।
যেভাবে চলে এই ‘ডিজিটাল চালান’
কসবার সীমান্ত এলাকা থেকে মাদকের চালানটি যখন যাত্রা শুরু করে, তখন কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে হৃদয় ও সরোয়ারের বাহিনী।
১. প্রথম স্তর (বর্ডার অবজারভেশন): সীমান্তের শূন্য রেখায় পাহারায় থাকা সদস্যরা ওয়াকিটোকিতে সংকেত দেয় যে বিজিবি বা পুলিশের মুভমেন্ট কোন দিকে।
২. দ্বিতীয় স্তর (পাইলটিং): মূল চালানের আগে একটি মোটরসাইকেল বা ইজিবাইক ‘পাইলটিং’ করে। তাদের হাতে থাকে ডিজিটাল ডিভাইস।
রাস্তার প্রতিটি মোড়ে পুলিশের টহল আছে কি না, তা তাৎক্ষণিক জানানো হয় মূল ক্যারিয়ারকে।
৩. তৃতীয় স্তর (পরিবহন): সাধারণত চাল ও সবজির ট্রাক বা বিলাসবহুল প্রাইভেট কার ব্যবহার করে এই চালান ঢাকায় পাঠানো হয়। চালকের কাছে থাকে ওয়াকিটোকি, যার মাধ্যমে সে পেছনের কন্ট্রোল রুমের সাথে যুক্ত থাকে।
সন্ত্রাসী লায়ন শাকিলের প্রভাব ও বর্তমান পরিস্থিতি
সন্ত্রাসী লায়ন শাকিল বর্তমানে পর্দার আড়ালে থাকলেও তার অনুসারীরা মাঠ পর্যায়ে অত্যন্ত সক্রিয়। হৃদয় চৌধুরী মূলত শাকিলের সেই ‘পেশি শক্তি’ এবং বাদশাহ জুয়েলের ‘মাদক নেটওয়ার্ক’—এই দুইয়ের সমন্বয় ঘটিয়েছেন। কসবার বিভিন্ন ইউনিয়ন এবং গ্রামগুলোতে এই সিন্ডিকেটের বেতনভুক্ত ‘লাইনম্যান’ রয়েছে, যারা ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে নিয়মিত তথ্য আদান-প্রদান করে।
প্রশাসনের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, এই চক্রটি যে ওয়াকিটোকিগুলো ব্যবহার করছে সেগুলো উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির। সরকারি অনুমতি ছাড়া এ ধরনের ওয়াকিটোকি রাখা বা ব্যবহার করা সম্পূর্ণ অবৈধ। ড্রোন এবং সিসিটিভি ক্যামেরা ব্যবহার করে সীমান্ত নজরদারির কথা উঠলেও, চোরাকারবারীদের এই ‘ওয়াকিটোকি নেটওয়ার্ক’ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য এক নতুন মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, “তারা এখন পুলিশের চেয়েও বেশি আধুনিক। আমরা দেখি পাহাড়ের ওপর থেকে তারা ওয়াকিটোকিতে কার সাথে যেন কথা বলে। আমরা মনে করেছিলাম তারা হয়তো সরকারি কোনো সংস্থার লোক, কিন্তু পরে বুঝলাম এরা মাদক ব্যবসায়ী।
উপসংহার কসবার মাদক ও চোরাচালান এখন আর কেবল গুটিকয়েক অপরাধীর ব্যক্তিগত কাজ নয়, এটি একটি সুসংগঠিত ‘ডিজিটাল ক্রাইম সিন্ডিকেট’।
হৃদয় চৌধুরী ও সরোয়ার আলমের এই অত্যাধুনিক মাদক সাম্রাজ্য গুড়িয়ে দিতে হলে কেবল অভিযান যথেষ্ট নয়, বরং সাইবার নজরদারি এবং ফ্রিকোয়েন্সি ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে তাদের এই যোগাযোগের মাধ্যমগুলো বিচ্ছিন্ন করা জরুরি। অন্যথায়, সীমান্তের এই বিষাক্ত নীল দংশন থেকে দেশের তরুণ সমাজকে রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
বি.দ্র.: এই প্রতিবেদনটি প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপই পারে কসবার এই ডিজিটাল মাদক সাম্রাজ্যের ইতি টানতে
মন্তব্য করুন