বিশেষ প্রতিবেদন
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার সীমান্তরেখা এখন আর কেবল কাঁটাতারের বেড়া নয়, এটি পরিণত হয়েছে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক বড় অশনি সংকেতে। প্রশাসনের নজরদারি আর বিজিবির টহল সত্ত্বেও কসবার প্রায় ১৩টি পয়েন্ট দিয়ে অবাধে ঢুকছে ভারতীয় অস্ত্র, মাদক এবং ভারতীয় পণ্য। তবে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা কেবল চোরাচালান নয়, বরং দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি।
বিশেষ করে চকবস্তা সীমান্ত দিয়ে দেশের চিহ্নিত অপরাধীদের পলায়ন এবং নয়নপুর-সালদা দিয়ে অস্ত্রের চালান প্রবেশের ঘটনা পুরো সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। চোরাকারবারিরা প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন ও অভিনব পন্থায় তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
চকবস্তা: অপরাধীদের পলায়ন রুট ও অস্ত্র-শাড়ির করিডোর
আমাদের অনুসন্ধানে সবচেয়ে ভয়াবহ যে তথ্যটি উঠে এসেছে, তা হলো চকবস্তা সীমান্তের বর্তমান পরিস্থিতি। এই পয়েন্টটি এখন আর সাধারণ চোরাচালান রুট নয়; এটি পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের দাগী ও চিহ্নিত অপরাধীদের ‘সেফ প্যাসেজ’-এ। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বড় কোনো অপরাধ বা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে সন্ত্রাসীরা গা ঢাকা দিতে বেছে নিচ্ছে এই চকবস্তা সীমান্ত। দালাল চক্রের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তারা রাতের আঁধারে এই রুট দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাচ্ছে। আবার একইভাবে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা এই পথ ব্যবহার করে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।
শুধু মানবপাচার বা অপরাধীদের পারাপারই নয়, চকবস্তা এখন অবৈধ অস্ত্রের চালানের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার। ছোট আগ্নেয়াস্ত্র থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরণের গোলাবারুদ এই পথে ঢুকছে। এর পাশাপাশি, অবৈধভাবে ভারতীয় শাড়ির বিশাল বিশাল চালান আসছে এই রুট দিয়ে। কর ফাঁকি দিয়ে আসা এসব শাড়ি স্থানীয় বাজার সয়লাব করে ফেলছে, যার নেপথ্যে রয়েছে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট।
নয়নপুর ও সালদা নদী: গরু ও অস্ত্রের ট্রানজিট
সীমান্তের আরেক গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট নয়নপুর এবং সালদা নদী এলাকা। যোগাযোগ ব্যবস্থার সুবিধার কারণে এই এলাকাটি চোরাকারবারিদের কাছে অত্যন্ত লোভনীয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নয়নপুর ও সালদা নদী এলাকা দিয়ে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি প্রবেশ করছে ভারতীয় গরু। করিডোর বা শুল্ক ফাঁকি দিয়ে রাতের আঁধারে কাঁটাতার ডিঙিয়ে বা নদী পার করে হাজার হাজার গরু আনা হচ্ছে।
তবে ভয়ের কারণ কেবল গরু নয়। গরুর চালানের আড়ালে এই রুট দিয়েও ঢুকছে অস্ত্রের চালান।
আকবপুর, খিরনাল ও ধজনগর: ইয়াবা আর গাঁজার স্বর্গরাজ্য
মাদকের ভয়াবহ থাবা কসবার আকবপুর, খিরনাল এবং ধজনগর সীমান্ত এলাকাকে গ্রাস করেছে। এই তিনটি পয়েন্ট এখন কার্যত ‘মাদকের ওপেন গেট’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। মূলত ইয়াবা এবং গাঁজা পাচারের জন্য এই রুটগুলো একচেটিয়াভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সীমান্তের ওপার থেকে বস্তায় বস্তায় গাঁজা এবং পলিথিনে মোড়ানো ইয়াবার প্যাকেট এই গ্রামগুলোতে প্রবেশ করে। এখানকার স্থানীয় অনেক যুবক, এমনকি নারীরাও জড়িয়ে পড়েছে মাদক বহনের কাজে। কৃষি কাজ বা ঘাস কাটার ছলে সীমান্তের ওপারে গিয়ে তারা শরীরের বিভিন্ন অংশে বা কৃষি পণ্যের ভেতরে লুকিয়ে মাদক নিয়ে আসছে। ধজনগর ও খিরনালের ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে, বিজিবির টহল দলের মুভমেন্ট দূর থেকেই টের পাওয়া যায়, যা পাচারকারীদের পালিয়ে যেতে সাহায্য করে।
বায়েক, মন্দভাগ ও পেট্রোবাংলা: থেমে নেই তৎপরতা
এর বাইরে বায়েক, মন্দভাগ, পেট্রোবাংলা, মইনপুর, গঙ্গানগর ও জয়নগর দিয়েও নিয়মিত ভারতীয় পণ্য এবং মাদক প্রবেশ করছে। যদিও চকবস্তা বা নয়নপুরের মতো হাই-প্রোফাইল চোরাচালান এখানে কিছুটা কম, তবুও এই রুটগুলো দিয়ে ফেন্সিডিল এবং প্রসাধনী সামগ্রী অবাধে আসছে। বিজিবির অভিযানে মাঝেমধ্যে কিছু চালান আটক হলেও, তা সমুদ্রের এক ঘটি জলের সমান।
অভিনব কৌশল ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য
চোরাকারবারিরা এখন আর সনাতন পদ্ধতিতে নেই। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিতে তারা অবলম্বন করছে অভিনব সব কৌশল: ১. পণ্যবাহী বাহন: সিএনজি বা ট্রাকের চেসিসের ভেতরে গোপন কুঠুরি বানিয়ে অস্ত্র ও মাদক পাচার। ২. মানব ঢাল: স্থানীয় দরিদ্র নারী ও শিশুদের ব্যবহার করে মাদক বহন। ৩. প্রযুক্তি: ওয়ারল্যাস ওয়াকি টকি ও বিশেষ সংকেত, টর্চ লাইট ব্যবহার করে বিজিবির অবস্থান নিশ্চিত হয়ে পণ্য পারাপার। ৪. পণ্য বৈচিত্র্য: কখনো গরুর পেটে ইয়াবা, কখনো ভারতীয় শাড়ির ভাজে অস্ত্রের গুলি—এভাবেই চলছে প্রতারণা।
জনমনে আতঙ্ক ও করণীয়
সীমান্তবর্তী এই এলাকাগুলোর সাধারণ মানুষ এখন জিম্মি। বিশেষ করে চকবস্তা দিয়ে অপরাধীদের আনাগোনা বাড়ায় স্থানীয়দের মাঝে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতা স্থানীয় কিশোর গ্যাং কালচার ও রাজনৈতিক সহিংসতাকে উসকে দিচ্ছে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর অভিযান অব্যাহত থাকলেও, এই বিশাল সিন্ডিকেট ভাঙতে হলে প্রয়োজন আরও কঠোর নজরদারি। বিশেষ করে চকবস্তা পয়েন্টকে ‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করে সার্বক্ষণিক মনিটরিং এবং নয়নপুর-সালদা রুটে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো জরুরি। চিহ্নিত অপরাধীরা যাতে এই পথ ব্যবহার করে পালাতে না পারে, সেজন্য জিরো পয়েন্টে আধুনিক সার্ভেইলেন্স সিস্টেম স্থাপন সময়ের দাবি।
কসবা সীমান্ত দিয়ে এই অবৈধ অস্ত্র ও মাদকের স্রোত যদি এখনই থামানো না যায়, তবে তা অদূর ভবিষ্যতে পুরো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে।
প্রতিবেদক: তালাশ ক্রাইম দৃষ্টি টিম
মন্তব্য করুন