দ্বীন ইসলাম
এ নেশার কারণে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ বিশেষ করে যুব সমাজ। মাদকের নীল দংশনে তরুণ সমাজ আজ বিপথগামী ও বিপন্ন। এর বিষবাষ্প দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে। মাদকের বিষাক্ত ছোবল গ্রাস করে চলেছে নতুন প্রজন্মকে। ফলশ্রুতিতে এর বিষাক্ত কামড়ে অকালে ঝরে পড়ছে বহু তাজা প্রাণ। শূন্য হচ্ছে অনেক মায়ের বুক। সে সন্তান হারা মা–বাবার আহাজারিতে দিন দিন ভারি হচ্ছে বাতাস। ভোক্তভোগী পরিবারগুলোতে এখন শুধু শোকের মাতম। কারা সৃষ্টি করছে এমন দুর্বিসহ পরিস্থিতি? কারা ছড়িয়ে দিচ্ছে এ ভয়ানক আতংক। কারা কেড়ে নিচ্ছে মায়ের বুক থেকে তার প্রিয় সন্তানকে, দায়ী কারা? আজ আমরা এমনই এক বৈরি পরিবেশে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি ।
মাদক জীবন থেকে জীবনকে কেড়ে নেয়। জীবন একটাই। আর সুন্দরভাবে বাঁচার নামই জীবন। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে মাদকমুক্ত দেশ গড়ে তুলতে হবে। এই লক্ষ্যে মাদকের বিরুদ্ধে শিক্ষার ক্ষেত্রে পরিবারকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। আমাদের দেশ অনেক সূচকে এগিয়ে চলছে। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে যুব সমাজকে কাজে লাগাতে হবে। এই যুব সমাজের একটা বিশাল অংশই হচ্ছে শিক্ষার্থী। অথচ এই শিক্ষার্থীর অধিকাংশই বিশেষ করে ছাত্ররা নানা প্রকার মাদক গ্রহণ করে থাকে।
কলেজে আসা-যাওয়ার পথে অনেক ছাত্রকে অবনীলায় সিগারেট টানতে দেখি। তাদের সিগারেট টানার ভঙ্গি দেখে খুব আশ্চর্য হই। খুব বেশি বয়স হবে না ১৮ থেকে ২০ বছর এই বয়সেই তারা একজন বয়স্ক ব্যক্তির মত নির্দ্বিধায় সিগারেট টানছে আর গল্প করছে। একজন আরেকজনের সিগারেট ভাগাভাগি করছে। স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজে পা রেখেই অসৎ সঙ্গে অনেক শিক্ষার্থী মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। প্রায় আড়াই হাজার মাদকাসক্ত রোগীর ওপর চালানো জরিপে দেখা গেছে ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সী মাদকসেবীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ৮১.৩৭ শতাংশ। আর জরিপ ভুক্তদের ৬০.৭৮ শতাংশ মাধ্যমিক স্কুল পরীক্ষা পাস। ৬১.৪৭ শতাংশ মাদকসেবী প্রথম মাদক গ্রহণ করেছে বন্ধুর প্রভাবে। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদকসেবীর সংখ্যা বিপুল হারে বাড়ছে এমন উদ্বেগের কথা জানিয়ে ২০১৫ সালের ২৮ নভেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করে চিঠি পাঠায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
সকল ধর্মীয় অনুশাসনে মাদক একটি নিষিদ্ধ দ্রব্য। সমাজের উষালগ্ন থেকেই মাদক একটি সর্বনাশা নেশা এবং এটি একটি জাতিকে ধ্বংস করে দেয়। ধর্মীয় অনুশাসন ও নীতি নৈতিকতা মেনে চললে মাদকের বিরুদ্ধে প্রায় অর্ধেক কাজ হয়ে যায়। বাকি অর্ধেক কাজ আইন শৃঙ্খলা বাহিনীসহ সকল শ্রেণিপেশার মানুষ আন্তরিকতা নিয়ে করতে পারে। দেশের উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে গেলে যুবসমাজ এবং মাদকাসক্তদের মাদকের কুফল সম্পর্কে জানাতে হবে।
এক সময়ে সমাজের একটি বিশেষ শ্রেণির মানুষ কিছুটা আনন্দ বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে মাদককে বেছে নিত। বস্তি এলাকার সাথে জড়িত যুবক সমাজই এই মাদক গ্রহণ করত। কিন্তু এখন আর সেই চিত্র নেই। মাদক এখন সমাজের প্রতিটি শ্রেণির বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষের কাছে অতি আকর্ষণীয় পণ্যে পরিণত হয়েছে। যুবক থেকে শুরু করে নারী-পুরুষেরা শ্রেণীভেদে এখন মাদকে আসক্ত, এই আসক্তির কোন নির্দিষ্ট কারণ নেই। আগে যেমন ধারণা করা হত হতাশা, বেকারত্ব ও অসহায়ত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মাদক গ্রহণ করা হয়। কিন্তু বর্তমানে কোন কারণ ছাড়া শ্রেণিভেদে ও বয়সভেদে এই মাদককে জীবনের একটি অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে। সম্প্রতি পত্রিকাগুলোতে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংগঠিত মাদক বিরোধী সংবাদ প্রকাশ করে আমাদের শিক্ষার্থীদের ভয়াবহ মাদকাসক্তির খবর প্রচার করছে। এই মাদকাসক্তি শিক্ষার্থীদের সকল মেধা সৃজনশীলতাকে দিন দিন বিঘ্নিত করছে। কৌতূহল থেকে মাদকাসক্তির সৃষ্টি হয়। সুতরাং, সকল ছাত্র-ছাত্রীকে উৎসাহবশে মাদক গ্রহণ না করার দিকে সজাগ থাকতে হবে। শিক্ষকদের পাশাপাশি অভিভাবকদের আরো সচেতন ও সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। কতিপয় শিক্ষকদের কথা না বললেই নয়। দেখা যায়, ছাত্র-ছাত্রীদের সামনে অনবরত সিগারেট ফুঁকছেন। কোথায় শিক্ষার্থীদের মাদক থেকে বিরত থাকার জন্য উপদেশ ও আদেশ দেবেন এবং নিজে শিক্ষক হয়ে এই থেকে মাদক গ্রহণ করেন। এতে শিক্ষার্থীরা নির্লজ্জ ও আসক্ত হয়ে পড়ে আবার কোন কোন অভিভাবক আছেন যারা নিজ সন্তানদের সামনেই মাদক গ্রহণ করছেন। কেউ কেউ অত্যন্ত আদর সোহাগ করে সেই সন্তানকে দিয়ে মাদকদ্রব্য কিনতে দোকানে পাঠান। তাছাড়া আমাদের চারপাশে কোন বাধাবিহীনভাবে পথচারী থেকে শুরু করে অন্যান্যরা নির্দ্বিধায় তামাক জাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করে চলছে। ফলে একজন আরেক জন থেকে দেখে মাদকের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। আগামী প্রজন্ম যাদের ওপর এদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তারাই যদি মাদকাসক্তি হয়ে পড়ে তবে দেশের ভবিষ্যৎ দিন দিন অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে। প্রতিনিয়ত মাদকের করাল গ্রাসে থমকে যাচ্ছে সম্ভাবনাময় এক একটি জীবনের অধ্যায়। তাই ব্যক্তি ও পারিবারিক পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে বয়োজ্যেষ্ঠদের এগিয়ে আসতে হবে। মাদক যে একটি জীবন ও ভবিষ্যৎ বিধ্বংসী দ্রব্য, সেই ব্যাপারে সকলকে এক যোগে কাজ করতে হবে।
শিক্ষক হচ্ছে মানুষ গড়ার কারিগর এবং প্রশাসন হচ্ছে দেশ পরিচালনার হাতিয়ার। এই দুইটি পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মাদক বিরোধী অভিযান চালিয়ে শিক্ষাঙ্গন থেকে মাদককেন্দ্রিক অপরাধ দূর করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী কমিটি গঠনের মাধ্যমে মাদকবিরোধী গণসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। মাদকের ছোবল থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে বিভিন্ন উন্নত কৌশল গ্রহণ করতে হবে। বর্তমানে সারা দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদক প্রতিরোধ কমিটি গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
কোমলমতি শিক্ষার্থীদেরও প্রাথমিক পর্যায় থেকেই মাদকের কুফল সম্পর্কে সচেতন করতেই মাদক প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হচ্ছে। তাছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশেপাশের এলাকায় প্রতিনিয়ত মাদকবিরোধী অভিযান চালানোর সুপারিশ করা হয়। এই মাদকবিরোধী কমিটিতে ৫ (পাঁচ) জন সদস্য থাকবে। (১) একজন শিক্ষক, (২) একজন অভিভাবক (৩) একজন পরিচালনা কমিটির সদস্য (৪) একজন ছাত্র এবং (৫) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান।
শিক্ষামন্ত্রণালয় সূত্রমতে, দেশে ৩২ হাজার ৩১টি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে মাদক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ২১ হাজার ৮৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিক্ষার্থীরা পরিবার, সমাজ ও দেশের ভবিষ্যৎ। তাই এই জন্য শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টির পাশাপাশি তাদেরও প্রতিভা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। সুযোগ-সুবিধার অভাবে অনেক শিক্ষার্থীই এক সময় অন্ধকারে তলিয়ে যায়। তাই আলোর পথে পরিচালিত করার দায়িত্ব শুধু সরকার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নয়, আমার, আপনার, সবার।
বাঙালী জাতির প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে এদেশের ছাত্র ও যুব সমাজের ভূমিকাই ছিল মুখ্য। ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা আন্দোলন, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনসহ যে কোন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে এদেশের ছাত্র ও যুবসমাজই চালকের ভূমিকায় ছিল বলে ইতিহাস দেয়।
সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও ছাত্র ও যুবসমাজকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। জাতীয় ও সংস্কৃতির অগ্রগতিতে ছাত্র ও যুব সমাজের ভূমিকা বরাবরই অগ্রগণ্য। একটি জাতির উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি সৃষ্টিশীল যুবসমাজের মাধ্যমেই সম্ভবপর হয়। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপ ও উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে বর্তমানে ছাত্র ও যুবসমাজের বৃহৎ একটি অংশ মাদকের আগ্রাসনের শিকার হয়ে পড়েছে। দেশের যুব ও ছাত্র সমাজকে মাদকের আগ্রাসন হতে রক্ষা করে তাদেরকে সৃজনশীল ও কর্মক্ষম ভবিষ্যৎ প্রজন্মে রূপান্তর করতে সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে প্রয়াস চালাতে হবে। এখন আসা যাক ছাত্র ও যুব সমাজ কি কি কারনে মাদকাসক্ত হয়ে নিজের পরিবারের, সমাজের ও দেশের বোঝায় পরিণত হচ্ছে। তথ্যাভিজ্ঞ মহলের মতে দেশের ছাত্র ও যুবসমাজ মাদকাসক্ত হওয়ার পিছনে নি¤œলিখিত কারণগুলো অন্যতম:- ক) বাড়ন্ত বয়সে ছেলে-মেয়েদের প্রতি পিতা-মাতার উদাসীনতা। খ) সামাজিক বৈষম্যের কারণে হতাশাগ্রস্ত হয়ে ছাত্র-ছাত্রী বা যুবক-যুবতীরা মাদকের প্রতি আসক্ত হয়। গ) সীমান্ত দিয়ে অবাধে মাদকের প্রবেশ বা দেশে মাদকের সহজলভ্যতা। ঘ) বিদ্যমান আইনের অকার্যকারিতা বা আইন প্রয়োগে শিথিলতা। ঙ) বন্ধু-বান্ধবী বা সঙ্গ নির্বাচনে অসচেতনতা। চ) ধর্মীয় অনুশাসন বা রীতিনীতির প্রতি উদাসীনতা।
নানাবিধ কারণে ছাত্র-ছাত্রী বা যুবক-যুবতীরা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে।
সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে এই পরিস্থিতি উত্তরণের জন্য সমাজের সকল স্তরের লোকদেরকে এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি, ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা ও প্রাশাসনিক দৃঢ়তার মাধ্যমে এহেন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে নি¤œলিখিত উপায়ে মাদকের মরণ ছোবল থেকে যুব সমাজকে রক্ষা করা যাবে বলে তথ্যাবিজ্ঞ মহল মনে করেন। যেমন:- ক) একটি শিশু যখন ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে তখন সে তার প্রতি মা-বাবা বা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের আচরণ কেমন তা পর্যবেক্ষণ করে।
শিশু বা বাল্যবয়সে যে কেউ বিশেষ করে মা-বাবার কাছ থেকে ¯েœহশীল আচরণ প্রত্যাশা করে। কিন্তু কোন কোন মা-বাবা ব্যস্ততার অজুহাতে সন্তানের প্রতি যথাযথ ¯েœহ ও ভালবাসা প্রদান করতে ব্যর্থ হয়। তখন ঐ সন্তানের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং এক পর্যায়ে তা হতাশায় রুপ নেয়। এক্ষেত্রে মা-বাবাকে উঠতি বয়সের সন্তানের প্রতি যথাযথ আদর, ¯েœহ ও ভালবাসা প্রদর্শন করে তাদেরকে হতাশার রাজ্য থেকে ফেরৎ আনতে হবে। আরও একটি বিষয় মা-বাবাকে লক্ষ্য রাখতে হবে এবং তা হল স্কুল ও কলেজ পড়–য়া সন্তানদের হাতে যেন প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকা পয়সা দেওয়া না হয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ প্রাপ্তি অনেক সময় ছেলেমেয়েদের বিপথগামী করে তোলে। সর্বোপরি ¯েœহশীল মা-বাবাই পারে মাদকের সংস্পর্শহীন সন্তান সমাজকে উপহার দিতে। খ) ছাত্র ও যুব সমাজকে মাদকাসক্তি মুক্ত রাখতে হলে সামাজিক সাম্য সৃষ্টি করতে হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষাসহ সমাজের প্রতিটি ক্ষত্রে সকলের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং এই দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই পালন করতে হবে। গ) মাদকের সহজলভ্যতা রোধে প্রশাসনকে কার্যকর ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে (বিজিবি ও কোষ্ট গার্ড) দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে মাদকের কোন চালান দেশের অভ্যন্তরে প্রবশ করতে না পারে। অভিযোগ আছে, সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এক শ্রেণীর অসাধু সদস্য অর্থের বিনিময়ে মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে আঁতাত করে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর উধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অসাধু সদস্যদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও দেশের অভ্যন্তরে মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করতে হবে। ঘ) মাদকদ্রব্য প্রতিরোধে বর্তমানে দেশে যে আইনগুলো আছে, সেগুলোর আমূল সংস্কার করে সংক্ষিপ্ত বিচারের মাধ্যমে দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ঙ) মাদকাসক্ত ছাত্র ও যুব সমাজের একটি বড় অংশ অসৎ সঙ্গের কারণে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে তাদেরকে বন্ধু নির্বাচনে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে যারা নিজেদেরকে ধ্বংশের প্রান্তে নিয়ে গেছে, তাদের কাছে থেকে নিজেদেরকে নিরাপদ দূরত্বে রাখতে সচেষ্ট থাকতে হবে এবং এই পদ্ধতি অবলম্বন করে নিজেদেরকে মাদকমুক্ত রাখা যাবে বলে বিজ্ঞজনেরা মতামত ব্যক্ত করেছেন। চ) ধর্মীয় অনুশাসন ও রীতিনীতি প্রতিপালনের মাধ্যমে নিজেদেরকে মাদকমুক্ত রাখা যায়। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি মসজিদ-মন্দিরে ইমাম ও পুরোহিতরা যদি মাদকের কুফলগুলো সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারে, তাহলে অনেকাংশে মাদকের ব্যবহার প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। এছাড়াও স্কুল ও কলেজগুলোতে সভা ও সেমিনারের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের মাদকের কুফল সম্পর্কে সম্যক ধারণা দিতে পারলে ছাত্র-ছাত্রীদেরকে মাদকের ছোবল মুক্ত রাখা সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে মাদকদ্রব্য প্রতিরোধে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া মুখ্য ভূমিকা রাখতে পারে। মাদক বিরোধী সচিত্র প্রতিবেদন প্রচার ও প্রকাশের মাধ্যমে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া মাদক প্রতিরোধে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখতে পারে।
মানবধর্ম ও সমাজ ব্যবস্থার দৃষ্টিতে নেশা জাতীয় দ্রব্য উৎপাদন, ক্রয়–বিক্রয় ও সেবন গর্হিত কাজ হিসাবে পরিগণিত হলেও এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী ন্যায়নীতি বিসর্জন দিয়ে এসব উৎপাদন, বিতরণ ও পাচারের মাধ্যমে আয় করছে প্রভূত অর্থ, গড়ে তুলছে অবৈধ সম্পদ। অথচ এর খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষকে।
আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে বিচরণ করছে সর্বনাশা মাদক। ঘুনে পোকার মত কুরে কুরে খাচ্ছে মানব অস্থিমজ্জা। অজগরের ন্যায় হামুখে খাওয়ার উপক্রম করছে গোটা মানব জাতিকে। এ ভয়ানক পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব। অভিভাবকরা আতঙ্কিত, উৎকণ্ঠিত। তারা শংকিত কখন মাদকের স্রোতে দিক হারিয়ে নেশার জালে আটকা পড়ে যায় তাদের প্রিয় সন্তান। কখন ছোবল মেরে নেশাগ্রস্ত করে পাঠিয়ে দেয় মরণকূপে। এ ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে নিজের সন্তানকে রক্ষার জন্য মা–বাবার সাথে পুরো জাতি আজ শংকিত, আতংকিত।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে মাদক কি? ফেনসিডিল, হিরোইন, কোকেন, সিডাকসিন, ইনোকট্রিন, মরফিন, টেট্রাহাইড্রো ক্যানাবিনল, মেথাডন, বিয়ার, কেনা বিসরেসিন, এ্যাবসলিউট এ্যালকোহল, ভেষজ কেনাবিস, গাঁজা, দেশী–বিদেশী মদ প্রভৃতি। তবে বর্তমানে ফেনসিডিল আর ইয়াবার ব্যবহার হচ্ছে সর্বত্র। এর পরিণাম যে কি হবে তা নিয়ে ভাবলে শরীরে শিহরণ জাগে।
মাদক ব্যবহারে শরীরে স্বল্প মেয়াদী প্রতিক্রিয়া : মাদক রক্তচাপ কমায় এবং শ্বাস–প্রশ্বাসের মাত্রা হ্রাস করে। মাদক সেবনে ক্ষুধা ও যৌন অনুভূতি দ্রুত হ্রাস পায়। মতি বিভ্রম ঘটে এবং তার মধ্যে সন্ত্রস্ত ভাব দেখা যায়। শ্বাস–প্রশ্বাস ক্ষীণ থেকে ক্ষীনতর হয়। মাদকসেবী ক্রমে ক্রমে নিস্তেজ এবং অবসন্ন হয়ে যায়। হূদস্পন্দন বৃদ্ধি পেলে রক্তচাপও বৃদ্ধি পায়। চলাফেরায় অসংলগ্নতা ধরা পড়ে। স্মৃতি শক্তি ও মনোযোগের ক্ষমতা সাময়িক হ্রাস পায়। তাই যে কোন মুহুর্তে জীবন বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। চোখ লালচে হয় এবং মুখ শুকিয়ে যায়। উগ্র মেজাজ, নিদ্র্র্রাহীনতা ও রাগান্বিত ভাব দেখা যায়। চামড়ায় ফুসকুড়ি, বমি বমি ভাব এবং নানা পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অধিক মাত্রায় মাদক সেবী মাতালের মতো আচরণ করে এবং হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়ে।
মাদক ব্যবহারে শরীরে দীর্ঘ মেয়াদী প্রতিক্রিয়া : স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে থাকে। এছাড়া মস্তিস্কে কোষের ক্ষয় প্রাপ্তি ঘটতে পারে। স্মৃতি শক্তি লোপ পায়। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা জ্ঞান লোপ পায়। জীবনের সব বিষয় নিরাসক্ত হয়ে পড়ে। কোন কোন মাদকদ্রব্যে আসক্ত ব্যক্তিকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। মাদকাসক্ত মেয়েদের গর্ভের সন্তানের উপরও ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে এবং সন্তানও মাদকাসক্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
মাদক ব্যবহারে অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ক্ষতি : শ্বাস, প্রণালীতে ক্ষতি : খুসখুসে কাশি থেকে যক্ষা, ব্রঙ্কাইটিস, নিউমোনিয়া, ক্যান্সার, শ্বাস–প্রশ্বাস ক্ষীণ হওয়া। চোখের ক্ষতি : চোখের মনি সঙ্কুচিত হওয়া, দৃষ্টি শক্তি নষ্ট হয়ে যাওয়া। লিভারের ক্ষতি : জন্ডিস, হেপাটাইটিস, সিরোসিস ও ক্যান্সার। কিডনীর ক্ষতি : কার্যক্ষমতা হ্রাস পাওয়া, ঘন ঘন সংক্রমণ হওয়া, পরিশেষে কিডনী অকার্যকর হয়ে যাওয়া, হূদযন্ত্রের কার্যকারীতা হ্রাস পাওয়া ইত্যাদি। হূদযন্ত্র ও রক্ত প্রণালীতে ক্ষতি : হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া, হূদযন্ত্র বড় হয়ে যাওয়া, হূদযন্ত্রের কার্যকারীতা হ্রাস পাওয়া। রক্ত কণিকার সংখ্যায় পরিবর্তন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া, রক্তস্বল্পতা ইত্যাদি। খাদ্য প্রণালীতে ক্ষতি ঃ রুচি কমে যাওয়া, হজম শক্তি হ্রাস পাওয়া, আলসার, এসিডিটি, কোষ্ঠ কাঠিন্য, ক্যান্সার ইত্যাদি। ত্বকের ক্ষতি : ভিটামিন ও পুষ্টির অভাবে ত্বক হয়ে উঠে খসখসে শুস্ক। চুলকানী, ছত্রাক দ্বারা আক্রান্ত হওয়া, ফোঁড়া, ঘা ইত্যাদি। যৌন ক্ষমতা ও প্রজননের ক্ষতি : যৌন ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া, যৌন স্পৃহা কমে যাওয়া, বিকৃত শুক্র থেকে বিকৃত সন্তানের জন্ম, সন্তান জন্মদানে অক্ষমতা। সিফিলিস, গনোরিয়া, এইডস ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হওয়া। মেয়েদের ক্ষেত্রে এ প্রভাব আরো মারাত্মক। গর্ভের সন্তান বিকৃত হয়ে যাওয়া, মৃত সন্তান প্রসব করা, জকোলীন শিশুর স্বল্প ওজন, জন্মের সাথে সাথেই নবজাতকের বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হওয়া। মস্তিস্ক ও স্নায়ুতন্ত্র এবং মানসিক ক্ষতি : নেশাগ্রস্ত অবস্থায় প্রলাপ বকা, আত্মহত্যার প্রবণতা, পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কে অসচেতনতা, মাথা ঘুরানো, চিন্তা শক্তি লোপ পাওয়া, অমনোযোগিতা, স্নায়ুবিক দুর্বলতা, স্মরণশক্তি কমে যাওয়া, অস্থিরতা ও অধৈর্য অবস্থা, ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন, আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া, উদ্বেগ, ভয় পাওয়া, বিষন্নতা ইত্যাদি মানসিক রোগ দেখা দেয় অনেক ক্ষেত্রে।
মাদকসেবীদের চিহ্নিত করার উপায় : মাদকসেবীদের চিহ্নিত করার স্বাভাবিক লক্ষণগুলো হলো চোখে সাধারণ আকৃতির চেয়ে বড় করে তাকানো। হঠাৎ স্বাস্থ্যহানী বা আকস্মিক স্বাস্থ্যবান হয়ে যাওয়া। চোখ ও মুখ ফোলা এবং চোখ লালচে হওয়া। সামান্য বিষয়ে অতিরিক্ত রেগে যাওয়া। অধিক রাত করে ঘুমানো এবং বিলম্বে ঘুম থেকে উঠা। একাকী অন্ধকার নির্জন রশুমে সময় কাটানো। উদাসী–উদাসী ভাব এবং সবকিছুতে ভুল করা। নিকটাত্মীয় এবং পরিবার পরিজনদের সাহচর্য এড়িয়ে চলা। সব বিষয়ে সিদ্ধান্তহীনতা, হীনমন্যতায় ভোগা। বিষন্ন খেয়ালে ভাবনার গভীর অন্তরালে কিছু খোজাঁ। বেশী বেশী টাকা ব্যয় করা এবং অভিভাবকদের কাছ থেকে জোরপূর্বক টাকা আদায় করা। কখনো খাদ্যের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া আবার কখনো হ্রাস পাওয়া। নিজের শরীর স্বাস্থ্য ও পোশাকের প্রতি খেয়ালহীনতা ইত্যাদি সাধারণ কারণ, যা সহজেই ধরা পড়তে পারে।
পারিবারিক কর্তব্য : পারিবারিক ভাবে মাদক বা ড্রাগসেবীদের চিহ্নিত করতে পারলে, তাদের উচিৎ কাজ হলো– মাদকে আসক্তির মূল কারণ খুঁজে বের করা। প্রেম ঘটিত কোন কারণ হলে এর সুস্থ সুন্দর সমাধান দেওয়া। মানসিক পারিবারিক চাপ প্রয়োগ না করে তাকে ভালবাসা ও স্নেহের বন্ধনে আরো নৈকট্যে নিয়ে আসা। পরিবারের কেউ অন্ততঃ তার খুব কাছাকাছি হওয়া এবং বন্ধুত্বের সম্পর্কে আবদ্ধ হওয়া। সর্বোপরি তাকে বুঝিয়ে মাদক সেবন থেকে দূরে থাকতে সহায়তা করা।
সুতরাং, এ মাদক বা ড্রাগের কালো বিষাক্ত ভয়াবহ ছোবল থেকে নিজে বাঁচুন, আগামী প্রজেেক বাঁচান। পারিবারিক, ব্যক্তিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধ রক্ষা করুন। আসুন, অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে আমরা পরস্পর পরস্পরের সহযোগী বন্ধু হই। শুধু আইন করলেই হবে না, বিপ্লব করলেই হবে না, সংস্কারমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে জনসাধারণের বিশেষ করে যুব সমাজের মধ্যে প্রোথিত করতে হবে মাদকবিরোধী চেতনাকে, জোরদার করতে হবে এ আন্দোলনকে। আমরা সেদিনই মাদকবিরোধী আন্দোলনে সফল হবো–যেদিন সকলে মিলে সুস্থ জীবনবোধের চেতনায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠতে সক্ষম হবো। গড়ে তুলতে পারব সুস্থ, সুন্দর, সবল ও সমৃদ্ধ সমাজ ব্যবস্থা।
পবিত্র ক্বোরআন শরীফের সূরা বাকারায় বলা হয়েছে–হে নবী! আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। আপনি বলে দিন–এ দুটোর ব্যবহারই মহাপাপ।
সুষ্ঠুভাবে বাঁচার স্বার্থে আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটা সুস্থ, সুন্দর পৃথিবী গড়ার প্রত্যাশায় বিশ্ব বরণ্য গায়ক মাইকেল জ্যাকসনের সুরে আমরাও বলি Hail the world and make it better place to live in অর্থাৎ রিক্তশ্রী পৃথিবীতে শুভ বুদ্ধির জয় হোক।
আসুন, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে এবং সুন্দর আগামী গড়তে যার যার অবস্থান থেকে মাদক বিরোধী ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস চালাই।
লেখক : সাংবাদিক ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদক দ্বীন ইসলাম
মন্তব্য করুন