বিশেষ প্রতিনিধি, কসবা ব্রাহ্মণবাড়িয়া
মিথ্যা সংবাদ প্রচারের প্রতিবাদে কায়েমপুর ইউনিয়ন বিএনপির সংবাদ সম্মেলন ব্রাহ্মণবাড়িয়া কসবা উপজেলার কায়েমপুর ইউনিয়ন যুবদল নেতা বাদশা জুয়েলকে নিয়ে এশিয়ান টিভিতে প্রচারিত একটি মিথ্যা ও বানোয়াট সংবাদের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন।
চাঞ্চল্যকর বিস্তারিত আসছে পর্ব মাইনাস ছয় ৬
সীমান্তে অপ্রতিরোধ্য চোরাচালান সিন্ডিকেট: কসবায় মাদকের রমরমা বাণিজ্য, নেপথ্যে যারা
ব্রাহ্মণবাড়ি,য়ার সীমান্তঘেঁষা উপজেলা কসবা। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরেই চোরাকারবারিদের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) প্রায় প্রতিদিনই অভিযান চালিয়ে কোটি কোটি টাকার মাদক ও ভারতীয় অবৈধ পণ্য জব্দ করছে। সরকারি হিসাব মতে, গত এক বছরে কসবা সীমান্তে শত কোটি টাকার বেশি মূল্যের পণ্য আটক করা হয়েছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, বিপুল পরিমাণ পণ্য আটক হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে মূল হোতারা। মামলার নথিতে আসামির কোটা প্রায় শূন্য থাকায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
আঙুল ফুলে কলাগাছ: রাতারাতি কোটিপতি এই সিন্ডিকেট
অনুসন্ধানে জানা যায়, কসবা উপজেলার কুটি ইউনিয়নসহ সীমান্ত সংলগ্ন গ্রামগুলোতে এমন কিছু ব্যক্তি রয়েছেন, যারা মাত্র কয়েক বছর আগেও চরম অভাব-অনটনের মধ্যে দিনাতিপাত করতেন। ‘দিন এনে দিন খাওয়া’ সেই সব মানুষ আজ বিলাসবহুল গাড়ি ও অঢেল সম্পদের মালিক। সীমান্ত দিয়ে মাদক, চিনি এবং অবৈধ পণ্যের কারবার করে তারা রাতারাতি ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ বনে গেছেন। স্থানীয়দের মতে, তারা যেন একেকজন নিজ নিজ এলাকায় ছোটখাটো ‘রাজ্যের মালিক’ হয়ে উঠেছেন।
মাসুম পারভেজ: মাদক ও চিনি পাচারের ‘কি-ম্যান’
এই সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে নাম উঠে এসেছে কুটি ইউনিয়নের রানিয়ারা বিষ্ণুপুর গ্রামের আব্দুল মালেকের ছেলে মাসুম পারভেজ-এর। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাসুম পারভেজ দীর্ঘ দিন ধরে কাঠেরপুল হাইওয়ে রাস্তা ব্যবহার করে পিকআপ এবং প্রাইভেটকারে করে গাঁজার বড় বড় চালান দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করে আসছেন।
শুধু মাদকই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের সাথে চিনি চোরাচালানের যে বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, তারও সরাসরি নিয়ন্ত্রক এই মাসুম। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, পাকিস্তান থেকে ভারত হয়ে বাংলাদেশে আসা অবৈধ ‘রেণু’ (বিশেষ কোনো পণ্যের কোড বা চোরাচালানি পণ্য হতে পারে) পাচারের সাথেও তার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছে বিভিন্ন অনুসন্ধানী সূত্র। ‘তালাশ ক্রাইম দৃষ্টি’র অনুসন্ধানেও তার এই আন্তর্জাতিক চোরাচালান রুটের সংযোগ উঠে এসেছে।
নেপথ্যের নায়ক ‘বাদশা জুয়েল’ ও তার সহযোগীরা
সিন্ডিকেটের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, বর্তমানে এই পুরো অপরাধ সাম্রাজ্যের প্রধান হিসেবে কাজ করছেন বাদশা জুয়েল। অত্যন্ত চতুর এই ব্যক্তি নিজে আড়ালে থেকে পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন। তাকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সহজে স্পর্শ করতে পারে না।বাদশা জুয়েলের এই অবৈধ সম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে ঢাল হিসেবে কাজ করছেন তার তথাকথিত ‘মিডিয়া উপদেষ্টা’ হৃদয় চৌধুরী। অভিযোগ রয়েছে, হৃদয় চৌধুরী কেবল নামেই উপদেষ্টা, মূলত তিনি অবৈধ মাদক ও ভারতীয় পণ্যের সরাসরি বাহক বা সমন্বয়ক হিসেবে মাঠ পর্যায়ে কাজ করেন। এছাড়া আদ্রা গ্রামের শহীদ ভূঁইয়ার ছেলে সারোয়ার হোসেন এই সিন্ডিকেটের অন্যতম সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ করছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
প্রশাসনের ‘নির্বিকার’ ভূমিকা ও জনমনে আতঙ্ক
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই সিন্ডিকেটের সদস্যদের নাম-পরিচয় এবং তাদের কর্মকাণ্ডের কথা ওপেন সিক্রেট হলেও প্রশাসন রহস্যজনকভাবে নীরব। মাঝেমধ্যে বাহক বা মাদক আটক হলেও গডফাদাররা সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। ফলে সিন্ডিকেটের সদস্যরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। হাইওয়েতে পুলিশের টহল থাকলেও কীভাবে মাসুম পারভেজের মতো কারবারিরা নির্বিঘ্নে পিকআপ ও প্রাইভেটকারে মাদক পাচার করে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
সীমান্তের নিরাপত্তা ও বর্তমান পরিস্থিতি
বিজিবি ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযানে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় চিনি, শাড়ি, কসমেটিকস এবং গাঁজা-ফেন্সিডিল উদ্ধার হচ্ছে। কিন্তু স্থানীয়দের দাবি, উদ্ধার হওয়া পণ্য মোট পাচার হওয়া মালের সামান্য অংশ মাত্র। বড় একটি অংশ সিন্ডিকেটের পকেটে চলে যাচ্ছে, যার ফলে সরকার হারাচ্ছে বিশাল অংকের রাজস্ব আর যুবসমাজ ধ্বংস হচ্ছে মাদকের ছোবলে।
উপসংহার
কসবা সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় অবৈধ পণ্য ও মাদকের এই জয়যাত্রা রুখতে না পারলে অদূর ভবিষ্যতে এই এলাকা অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে। মাসুম পারভেজ, বাদশা জুয়েল এবং সারোয়ার হোসেনের মতো হোতাদের আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ আশা করছেন, উচ্চমহল থেকে বিশেষ পদক্ষেপের মাধ্যমে এই ‘সীমান্ত মাফিয়া’দের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা হবে।
মন্তব্য করুন